সোমবার ২৭ জুলাই ২০২৬ - ১০:০৭
শত্রুর সঙ্গে চুক্তি—প্রজ্ঞা, নাকি আত্মসমর্পণের মানসিকতা? কুরআনের দৃষ্টিতে শত্রুভীতির যুক্তি

কুরআনের দৃষ্টিতে সংকটময় মুহূর্তে ঈমান, মর্যাদা ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের আহ্বানের পরিবর্তে যদি ভয়, আপস ও পশ্চাদপসরণের ভাষা প্রাধান্য পায়, তবে তা নিফাকের (মুনাফিকির) অন্যতম সুস্পষ্ট লক্ষণ। বাহ্যিকভাবে ‘প্রজ্ঞা’, ‘বাস্তববাদ’ কিংবা ‘দেশের স্বার্থরক্ষা’র যুক্তি তুলে ধরা হলেও, এ ধরনের প্রবণতা সমাজকে প্রতিরোধের পথ থেকে সরিয়ে নিষ্ক্রিয়তা, আপস ও আত্মসমর্পণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিহাসের প্রতিটি যুগে সত্যের পক্ষে অবস্থানকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কেবল বহিরাগত শত্রুর সামরিক শক্তি নয়; বরং সমাজের অভ্যন্তরে ভয়, সংশয় ও আত্মবিশ্বাসহীনতার বিস্তারও সমান বিপজ্জনক। যখন এসব প্রবণতা ‘প্রজ্ঞা’, ‘বাস্তববাদ’ বা ‘ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর’ মতো আকর্ষণীয় ভাষায় উপস্থাপিত হয়, তখন তা জাতির মনোবল দুর্বল করে এবং শত্রুর সামনে নতি স্বীকারের পথ সুগম করে। ‘হামাসা’ বিশেষ সংখ্যায় একদল গবেষক এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের আলোচনার সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: দেশের স্বার্থ রক্ষার যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি বা সমঝোতার প্রস্তাব উত্থাপিত হলে, কেন তা সমালোচনার মুখে পড়ে?

কুরআনের দৃষ্টিতে ভয়নির্ভর চিন্তার উৎস
কুরআনের ভাষায়, নিফাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—সংকটময় মুহূর্তে ঈমান, মর্যাদা ও আল্লাহর প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে ভয়ের ভাষা ব্যবহার করা এবং কেবল জাগতিক হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে মানুষকে শত্রুর সামনে পশ্চাদপসরণে উৎসাহিত করা।

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—

فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَىٰ أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ.

যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তুমি তাদের দেখবে তারা দ্রুত তাদের (শত্রুদের) দিকে ধাবিত হয় এবং বলে, ‘আমরা আশঙ্কা করছি, কোনো বিপদ আমাদের ওপর এসে পড়তে পারে।’” [সূরা মায়িদাহ- ৫২]

কুরআন এ আচরণের মূল কারণকে প্রজ্ঞা বা দূরদর্শিতা নয়; বরং অন্তরের ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ব্যাধির প্রকাশ ঘটে দুর্বল ঈমান, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের অভাব, বাহ্যিক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণের মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অতিরিক্ত ভীতির মাধ্যমে।

এটি কেবল অতীতের একটি ঘটনার বিবরণ নয়; বরং একটি চিরন্তন সামাজিক বাস্তবতার চিত্র। যখনই সত্যের পক্ষে অবস্থানকারীরা কোনো আগ্রাসী শক্তির মুখোমুখি হয়েছে, তখনই একদল মানুষ শত্রুর আগ্রাসন, অপরাধ বা সীমালঙ্ঘনকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু না করে প্রতিরোধের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতিকেই বড় করে তুলেছে। তাদের বক্তব্যে বারবার উচ্চারিত হয়েছে—‘আরও ক্ষতি এড়াতে হবে’, ‘বাস্তববাদী হতে হবে’, ‘জনগণকে রক্ষা করতে হবে’ কিংবা ‘উত্তেজনা এড়াতে হবে’। কিন্তু বাস্তবে এসব বক্তব্য জাতির মনোবল দুর্বল করে, শত্রুর আগ্রাসনকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করে যে আত্মসমর্পণ বা ছাড় দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

কুরআন এই মানসিকতাকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছে—

نَخْشَىٰ أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ.

অর্থাৎ, “আমরা আশঙ্কা করছি, কোনো বিপদ আমাদের ওপর এসে পড়বে।” এই ভয় মানুষকে মর্যাদার অবস্থান থেকে নিষ্ক্রিয়তার দিকে ঠেলে দেয়।

শত্রুর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও প্রতিরোধের মনোবল
অন্যত্র কুরআন এ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের উৎসও স্পষ্ট করেছে—

إِنَّمَا ذَٰلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ.

“এ তো শয়তান, যে তার অনুসারীদের ভয় দেখায়।” [সূরা আলে ইমরান- ১৭৫]

অপরদিকে, কুরআন এমন মুমিনদের কথা উল্লেখ করেছে, যাদের বলা হয়েছিল—

إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ.

লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেত হয়েছে; সুতরাং তাদের ভয় করো। [সূরা আল ইমরান- ১৭৩]

কিন্তু তারা ভীত না হয়ে বরং ঈমানে আরও দৃঢ় হয়ে বলেছিল—

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ.

আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক। [সূরা আল ইমরান- ১৭৩]

কুরআনের দৃষ্টিতে শত্রুর শক্তি দেখে ভীত হয়ে পড়া রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় নয়; বরং তা দুর্বল ঈমান এবং শত্রুর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের শিকার হওয়ার লক্ষণ।

প্রতিরোধকে ব্যয়বহুল দেখানো—ভয়ের পুনরুৎপাদন
আহলে বাইত (আ.)-এর জীবনাদর্শও একই শিক্ষা দেয়। আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.) নাহজুল বালাগা-য় শান্তিচুক্তির পরও শত্রুর ব্যাপারে অতিরিক্ত আশাবাদী হতে নিষেধ করে বলেন—
“শান্তিচুক্তির পরও শত্রুর ব্যাপারে সতর্ক থাকো; কারণ অনেক সময় শত্রু প্রতারণার উদ্দেশ্যে নিজেকে শান্তিপ্রিয় হিসেবে উপস্থাপন করে।”

অন্যত্র তিনি বলেন—

وَاللهِ مَا غُزِيَ قَوْمٌ فِي عُقْرِ دَارِهِمْ إِلَّا ذَلُّوا.

“আল্লাহর শপথ! কোনো জাতি নিজ ভূখণ্ডে আক্রান্ত হয়েছে, আর তারা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে—এমন হলে তারা অপমানিত হয়েছে।”

এ বক্তব্য যুদ্ধের প্রশংসা নয়; বরং আত্মরক্ষার চেতনাহীনতা, উদাসীনতা এবং প্রতিরোধের মনোবল হারানোর পরিণতি সম্পর্কে সতর্কবাণী।

কারবালার ঘটনাও এ সত্যের উজ্জ্বল প্রমাণ। যারা ইমাম হুসাইন (আ.)-কে সাহায্য করেনি, তারা সবাই সত্যকে অস্বীকারকারী ছিল না; বরং অনেকে জীবন, সম্পদ, পদমর্যাদা ও ভবিষ্যতের ভয়ে নীরব ছিল। সেই নীরবতাই ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পথ সুগম করেছিল।

এ কারণেই কখনও কখনও সত্য প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা শত্রুর অস্ত্র নয়; বরং সেই মানসিকতা, যা ভয়কে ‘প্রজ্ঞা’ এবং পশ্চাদপসরণকে ‘দূরদর্শিতা’ বলে আখ্যায়িত করে।

কুরআনের মানদণ্ড
সুতরাং, প্রকাশ্য আগ্রাসন ও শত্রুতার মুখে যদি কেউ ন্যায়বিচারের দাবি ও আগ্রাসনের নিন্দা না করে কেবল পশ্চাদপসরণ, শত্রুর প্রতি আস্থা বা প্রতিরোধের অসারতার প্রচার করে, তবে সেই অবস্থানকে কুরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষার আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত।

কুরআন এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পাশাপাশি সাহস, তাওয়াক্কুল এবং আত্মমর্যাদাবোধও সমানভাবে লালিত হবে।

যে সমাজ সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেবল শত্রুর বাহ্যিক শক্তিকেই মানদণ্ড বানায়, সে সমাজ একসময় তার স্বাধীনতা ও মর্যাদাও হারিয়ে ফেলে। পক্ষান্তরে, যে সমাজ যুক্তিসঙ্গত পরিকল্পনার পাশাপাশি আল্লাহর প্রতিশ্রুতির প্রতিও আস্থা রাখে, তারা যেমন বেপরোয়া অভিযানে জড়িয়ে পড়ে না, তেমনি ‘প্রজ্ঞা’র ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা ভয়েরও শিকার হয় না।

কুরআনের ভাষায়, মর্যাদা একমাত্র আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং মুমিনদের জন্য। ভয়, আত্মবিস্মৃতি ও শত্রুর ওপর নির্ভরশীলতার মাধ্যমে কোনো জাতি কখনো প্রকৃত নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সম্মান অর্জন করতে পারে না।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha